কাশ্মিরে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার আট বছর বয়সী শিশু আসিফা বানুর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমে আইনজীবী দীপিকা এস রাজাওয়াত নিজেই ‘ধর্ষণ ও
হত্যার শিকার হওয়ার’ হুমকিতে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। তার জীবননাশের শঙ্কার কথা
জানিয়ে গত ১৫ এপ্রিল ইন্ডিয়ান মিডিয়াগুলোকে বলেছেন, দেশটির সুপ্রিম কোর্টের কাছে
সুরক্ষা চেয়েছেন তিনি।
এ বছরের জানুয়ারিতে ইন্ডিয়া অধিকৃত কাশ্মীরের কাঠুয়ার উপত্যকায়
ঘোড়া চড়ানোর সময় অপহরণ করা হয় আসিফাকে। আদালতে দায়ের করা মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আসিফা নামের ওই শিশুকে অপহরণের জন্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি
কর্মকর্তা ও দেবীস্থান মন্দিদের হেফাজতকারী সানজি রাম তার ভাগ্নে ও একজন পুলিশ
সদস্যকে নির্দেশ দেয়। নির্দেশ বাস্তবায়নের পর সাত দিন ধরে মন্দিরে আটকে রেখে একদল
হিন্দু পুরুষ ধর্ষণ করে আসিফাকে। পরে মাথায় পাথর মেরে ও গলা টিপে হত্যা করা হয়
তাকে। আসিফাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটজনকে অভিযুক্ত করেছে ইন্ডিয়ার
আদালত। মধ্য জানুয়ারির এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মঙ্গলবার দিন অভিযোগপত্র
জনসম্মুখে আনা হয়। জানুয়ারিতে এ নিয়ে তেমন উত্তেজনা না হলেও এ ঘটনায় অভিযোগপত্র
দেওয়ার পর সোচ্চার হয়ে ওঠে সারা ইন্ডিয়া।
আসিফা হত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বলে ইন্ডিয়ান
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যের পর মাহবুবা মুফতি সরকার থেকে পদত্যাগে বাধ্য
হন দুই বিজেপি নেতা। মোদি বলেছিলেন, আমি দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই যে কোনও
দোষীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের মেয়েরা
অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে।
আসিফার পরিচয়:
জম্মুর কাঠুয়া জেলার বাসিন্দা ৫২ বছরের মোহাম্মদ ইউসুফ পুজ্বালা। তিনি একজন যাযাবর মুসলিম মেষপালক সম্প্রদায়ের মানুষ। যারা গুজ্জর নামে পরিচিত। গরু, ছাগল, ঘোড়া প্রতিপালনই তাদের পেশা। গত ১০ জানুয়ারী নিখোঁজ হয় আট বছরের ফুটফুটে মেয়ে আসিফা। দু’দিন ধরে খুঁজে না পেয়ে তাঁরা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করতে যান। কিন্তু পুলিশ তাঁদের কোন রকম সাহায্য করেনি। উল্টে অপবাদ দিয়েছে যে, তাদের মেয়ে হয়তো কোন ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মুখে এমন অভদ্র ও নিম্মরুচির ভাষা প্রকাশ পাওয়ার পর তারা হতাশ হয়ে পড়েন। ১৭ জানুয়ারী এক প্রতিবেশী জানায়, বাড়ি থেকে কিছু দূরে বনের মধ্যে ক্ষতবিক্ষত এক লাশ পড়ে আছে। তারা সেখানে গিয়ে দেখেন এটা আসিফারই লাশ। নির্মম নির্যাতনের কারণে তার পা ভেঙ্গে গেছে, সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। জানা যায় দুর্ঘটনায় দুই সন্তানকে হারানোর পর কোনো এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শিশু কন্যা আসিফাকে দত্তক নেন মোহাম্মদ ইউসুফ ও নাসীমা বিবি। নাসীমা বিবি সাংবাদিকদের
জানিয়েছেন, আসিফা ছিল চড়ুই পাখির মত সদা চঞ্চল, হরিণের মতো নিরীহ ও নিষ্পাপ। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আসিফা ছিলো প্রতিবেশীদের কাছে খুবই প্রিয়মুখ। আসিফার
পরিবারের হয়ে মামলা লড়ছেন আইনজীবী দীপিকা এস রাজাওয়াত। গত ১৫ এপ্রিল এনডিটিভিকে তিনি
জানান, তাকেও হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। দীপিকা বলেন, আমি জানি না কতদিন জীবিত থাকতে
পারব। আমি ধর্ষণের শিকার হতে পারি। আমার সম্মান ক্ষুণ্ণ করা হতে পারে। আমার ক্ষতি করা
হতে পারে। গতকাল আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, ‘আমরা তোমাকে ক্ষমা করব না’। সুপ্রিম কোর্টকে
বলব যে, আমি হুমকিতে আছি।”
১৬ এপ্রিল সোমবার কাঠুয়ার দায়রা জজ আদালতে আসিফাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিচার শুরু হয়েছে। তবে আসিফার পরিবারও নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছে। এরমধ্যে মালার বিচার কার্যক্রম কাঠুয়া থেকে চন্ডিগড়ে স্থানান্তরের আবেদন জানিয়েছেন আসিফার বাবা। এ ব্যাপারে আইনজীবী দীপিকা বলেন, জম্মুর পরিস্থিতি, কাঠুয়ার আইনজীবীদের বিরোধিতা এবং অভিযোগপত্র দায়ের করতে বাধা দেয়া দেখে আমরা শঙ্কিত। এ কারণে বিচারিক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ হবে না। এ মামলা অন্য কোনও রাজ্যের আদালতে স্থানান্তরের জন্য আমরা সুপ্রিম কোর্টের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। উল্লেখ্য যে, আদালতের ভেতরে আইনজীবীরা এ নৃশংস ঘটনার আসামীদের সমর্থন করে ভারত মাতা কি জয়, জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়েছে। ইন্ডিয়ার কিছু অঞ্চলের উগ্র হিন্দুরা জয় শ্রী রাম শ্লোগান দিয়ে আন্দোলন করেছে! এমনকি অভিযুক্তদের পক্ষে র্যালী করেছিলো দ্য জম্মু বার অ্যাসোসিয়েশন। অভিযোগপত্র দায়েরে বাধাও দিয়েছিলো তারা। পুলিশের তদন্তে সন্তুষ্ট নয় বলে জানিয়েছে জম্মু বার অ্যাসোসিয়েশন। এ ঘটনায় সিবিআই তদন্তের দাবি করে ১২ দিনের ধর্মঘটও পালন করছেন উগ্র হিন্দু আইনজীবীরা। সূত্র: এনডিটিভি।
প্রশ্ন হলো, একটা জঘন্য অপরাধের ঘটনার অপরাধীদের পক্ষে মিছিল-মিটিং
করা কি কোনো সভ্য দেশে কল্পনা করা যায়? অথচ এসব ঘটনা ইন্ডিয়ার জন্য একেবারেই মামুলি।
ইন্ডিয়া সারা দুনিয়ার কাছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত। বাস্তবতা হলো,
চরম হিন্দুত্ববাদ দেশটির গভীরে প্রোথিত। অনেকে বলছেন, বর্তমানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী
দল বিজেপি ক্ষমতায় থাকার কারণে এমনটি হচ্ছে। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা
লাভের পর থেকেই উগ্র হিন্দুত্ববাদ দেশটির প্রধান শক্তি। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, দাঙ্গা-হাঙ্গামা
দেশটির নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গায় হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাবাজরা
এহসান জাফরী নামের একজন এমপিকে হত্যা করেছিলো। হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাবাজরা দুনিয়াখ্যাত
ক্রিকেটার আজহার উদ্দিনের হায়দরাবাদের বাড়ীতেও হামলা করেছিলো।
এদিকে ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্ট জম্মু ও কাশ্মিরের প্রাদেশিক সরকারকে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার ৮ বছর বয়সী শিশু আসিফার পরিবার ও তাদের আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছে। সোমবার আসিফার বাবা নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে মামলাটি কাশ্মির আদালত থেকে সরিয়ে চন্দ্রিগড় আদালতে স্থানান্তরে আবেদন জানালে আদালত এসব আদেশ দেয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে মামলা স্থানান্তরে প্রাদেশিক সরকারের মতামত চেয়েছে আদালত। একই দিন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে মামলা স্থানান্তরের আবেদন জানায় আসিফার বাবা। অপর
দিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলেছেন এ মামলায় আসিফার পরিবারের অপর আইনজীবী তালিব হুসেইন। সোমবার আসিফার পরিবাবের পাশাপাশি তাদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আসিফা হত্যাকান্ডের
ঘটনায় আট জনকে আটক করেছে পুলিশ। যাদের মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চারজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একজন কিশোর। ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সঞ্জী রাম অভিযোগ করেন, পুলিশ কর্মকর্তারা সুরেন্দ্র বর্মা, আনন্দ দত্ত এবং তিলক রাজ মিখর খাজুরিয়ার সহায়তায় এ অপরাধ পরিকল্পনা করেছিলেন। রামের ছেলে বিশাল, তার ভাগ্নে, একজন কিশোর এবং তার বন্ধু পরেশ কুমারও ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত।
জানা যায় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি গুজ্জর সম্প্রদায়কে জম্মু ত্যাগ করার জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেছিলেন। জম্মুতে এরা জীবিকা নির্বাহ করতে বনভূমি ব্যবহার করে, যা নিয়ে সম্প্রতি এ অঞ্চলের কিছু হিন্দু বাসিন্দাদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এমনকি আসিফাকে কবরস্থ করার জন্য কবরস্থানে নিয়ে গেলে সেখানে সশস্ত্র কিছু হিন্দু তাদের হুমকি দেয়। সে জমি তাদের দখলে বলে কবর দিতে বাধা সৃষ্টি করে। অথচ সেখানে এর আগে বেশ কয়েকজনকে কবরস্থ করা হয়েছিল।
আরো জানা যায় যে, বহুদিন ধরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বনভূমিকে নিয়ে বিবাদ চলছিল। উপজাতি অধিকার কর্মী ও আইনজীবী তালিব হুসেন বলেন, “এই দুর্ঘটনার কারণ জমি।” আসিফার পরিবারের সমর্থনে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন জনাব হুসেন। বিপরীতে অভিযুক্তদের আইনজীবী অঙ্কুর শর্মা অভিযোগ করেন যে মুসলমান জম্মুতে জনসংখ্যা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে, যেখানে হিন্দু বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। “তারা আমাদের বন এবং জল সম্পদে অনধিকার প্রবেশ করে”। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধীরা এখনো মুক্ত।
পরিশেষে এ টুকুই বলতে হয় যে, এলাকার দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদ ষড়যন্ত্রের পরিণামে আট বছরের নিষ্পাপ ফুলের মতো এ নিষ্পাপ শিশুর বিভীষিকাময় ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। জমি সংক্রান্ত বিবাদের জের ধরেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, নিষ্পাপ শিশু আসিফার এ চরম নির্মম পরিণতির জন্য যারা দায়ী তারা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।


0 মন্তব্যসমূহ