যে কোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক, কষ্টকর। মৃত্যু স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যে ভাবেই হোক না কেন। মৃত্যু মানেই বেদনা, কান্না ও একগাদা হতাশা টেনে আনে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আমাদের দেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার ক্রমশ বাড়ছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা। অনেক আগের কথা বাদ দিলেও আমাদের সময়ে যে সামাজিক বন্ধন ছিলো-এখন তার সিকি ভাগও নেই। পরিবারের বড়জনকে আমরা যে ভাবে শ্রদ্ধা করতাম-তার ছিটেফোটাও এখন দেখা যায় না। একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সেতো বহু দূরের কথা। ব্যতিক্রম যে একেবারে নেই তা নয়। তবে একেবারেই নগণ্য।

পতেঙ্গা সমুদ সৈকত থেকে তরুণীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় সামাজিক অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতার রূপ ব্যাপক ভাবে ফুটে উঠেছে। বুধবার ০২ মে সকাল ৯টার দিকে সমুদ্র সৈকত এলাকার ১৮ নম্বর ব্রিজের উত্তরপাশ থেকে অজ্ঞাত এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশপরে তার পরিচয় জানা যায়। সে নগরীর সানশাইন গ্রামার স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তাসফিয়া আমিন (১৬) তার লাশ উদ্ধারের পর তাসফিয়ার কথিত প্রেমিক আদনান মির্জাকে আটক করেছে পুলিশ সিএমপি কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার জাহেদুল ইসলাম জানান, তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার প্রেমিক আদনানকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আটক করা হয়েছে। তবে তাসফিয়ার সাথে সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও হত্যার কথা অস্বীকার করেছে আদনান। যার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই চলছে

এর আগে ২০১৬ সালের প্রথম দিকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শিশুহত্যা ও অপহরণের মাত্রা ব্যাপক ভাবে বেড়ে যায়। রাজধানীতে ভাই বোনকে বাসার ভেতর শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর শিশুটির পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছিলেন চায়নিজ রেস্তোরাঁর খাবার খেয়ে শিশু দুটি মারা গেছে কিন্তু ময়না তদন্ত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছে এবং শিশুদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। রাজধানীতে রহস্যজনকভাবে দুই শিশু হত্যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার এক দিন আগে কুমিল্লায় সৎ ভাইয়ের হাতে মারা যায় আরো দুই শিশু। শুধু কুমিল্লা জেলাতেই চার দিনে চার শিশুকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে একটি শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়। মাত্র কয়েক দিন আগে হবিগঞ্জের বাহুবলে একসাথে চার শিশুকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছে। শিশু অধিকার ফোরাম নামে একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে ২০১৬ সালের দুই মাসে মারা গেছে ৪৯ জন শিশু। গত বছর মারা গেছে ২৯২ জন। ২০১৪ সালে সংখ্যা ছিল ৩৬৬ জন।   

নির্মম এসব হত্যাকান্ডের অনেক ঘটনার রহস্য অজানা থেকে যাচ্ছে। যেমন বাহুবল রাজধানীর কেরানীগঞ্জে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। ফলে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। আমরা মনে করি, শিশু হত্যার এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি সমাজে নির্মমতার কারণগুলো অনুসন্ধান করা দরকার। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে ধরণের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা যাবে না। একইভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সবাইকে জেগে উঠতে হবে

৮০ দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশনগুলোতে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপণের পাশাপাশি কিছু সামাজিক বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হতো এ ধরণের একটি বিজ্ঞাপন সে দেশের স্যালভেশন আর্মি দ্বারা স্পন্সরড ছিলো। একটি বিজ্ঞাপণের বিষয় ছিল হৃদয়গ্রাহী মধ্যরাতে এক কিশোরকে একটি বিলাসবহুল গাড়ি থেকে  ছুড়ে ফেলে দেয়া হতো! সাথে সাথে পেছনে একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠতেন, ‘আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) বিশ্বের সবচেয়ে অতৃপ্ত জাতি নিজেদের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি ডাস্টবিনে যেমন ফেলে দিতে পারি-তেমনি প্রিয় সন্তানদের স্বীয় স্বার্থে রাস্তায় ফেলে দিতে কুণ্ঠবোধ করি না (উই আর ন্যাশন অব থ্রো এওয়ে সোসাইটি) আমরা ফেলে দেওয়ার সমাজ এটি একটি সামাজিক ব্যাধি
১৮৭০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে দিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক বন্ধন অটুট ছিলো। পারিবারিক মূল্যবোধকে ধরে রাখার কারণেই সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন মজবুত ছিলো
কিন্তু বিংশ শতাব্দী শুরুর পর দুটি ওয়ার্ল্ডওয়ার আমেরিকানদের এনে দিয়েছিলো প্রচুর অর্থ-বৈভব। এরই আঙ্গিকে ক্রমেই আমেরিকান সমাজ দারুণভাবে ভোগবাদী হয়ে ওঠে। যার চিত্র উঠে এসেছে দুনিয়াখ্যাত টিভি সিরিয়ালডালাস’-এ। এ সিরিয়ালে একটি সুপার ধনী তেল কোম্পানির মালিক পরিবারের মধ্যে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বিবাদ, ষড়যন্ত্র এবং নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা ফুটে তোলা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক অবক্ষয়ের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করা যাবে না।
তবে সমাজের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তার বিশদ বিশ্লেষণ তেমনভাবে করা হয়নি। দেশে শিশুহত্যা ও কিশোর অপরাধ যে হারে বাড়ছে-তবে সমাজের হতাশা আর অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠছে। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই শিশুহত্যা বিভিন্ন কারণে হলেও সবচেয়ে ভয়াবহ যে চিত্র ফুটে উঠছে তা হলো বাবা-মায়ের হাতে সন্তান খুন। শিশু অপহরণ হচ্ছে আত্মীয়দের দ্বারা বা নিকট-আত্মীয়ের প্ররোচনায়। এমনকি পণবন্দি হিসেবে দাবিকৃত অর্থপ্রাপ্তির পরও শিশুহত্যা করা হচ্ছে। হত্যার একটাই উদ্দেশ্যে অপরাধীর পরিচয় গোপন করা। এসব অপরাধীদের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ট আত্মীয়

রাজধানীর উচ্চ মধ্যবিত্তদের আবাসন বলে চিহ্নিত বনশ্রীতে মা মাহফুজা মালেক নিজের দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এর কয়েকদিন পর সিলেটের এক অঞ্চলের মা সন্তানকে বিষ দিয়ে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়া বাহুবলে চার শিশুকে, যে কোনো কারণেই হোক অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। শিশু হত্যার এমনি ঘটনা অহরহ মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো মায়ের হাতে দু’জন নির্বোধ শিশুহত্যা। মায়ের আঁচল হলো সন্তানের জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা শত দুঃখ-যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্যে যে মা দশ মাস নিজের পেটে ধারণ করেছেন। সে মা কিভাবে নিজের শিশু সন্তানকে হত্যা করে? এ ধরণের ঘটনায় আতকে উঠতে হয়! মানসিক রোগী মাও তার শিশু সন্তানকে হত্যা করার ঘটনা সচরাচর ঘটে না। শিশু ঘাতক মা মাহফুজা মালেক বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদের পর বলেছিলেন, তিনি শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়তেন মানসিক অস্থিরতায় ভুগতেন। জানা যায়, সে পরিবার যথেষ্ট সচ্ছল। তার মানে টাকা-পয়সার অভাব নেই। সিলেটে মা তার সন্তানকে বিষ দিয়ে কেন মারলেন? কেন নিজ সন্তান হত্যার পর আত্মহত্যা করতে গেলেন? তার সঠিক কোনো তথ্য জানা যায়নি।

সিলেটের বাহুবলে চার শিশুকে অপহরণ করে হত্যা করে গর্তে দাফন করা সমাজের এক অস্থির চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে শিশু রাজন হত্যার পৈশাচিক দৃশ্য দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জে কিশোর ত্বকী হত্যার কোনো সুরাহা হয়নি। কেন অস্থিরতা? এর সাথে আমাদের বিত্তবান হয়ে ওঠা এবং হয়ে উঠার বাসনার কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা নিয়ে হয়তো গবেষণা হতে পারে। রাজন হত্যার পর হত্যাকারী টাকার বিনিময়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। সবখানেই চলছে টাকার খেলা। নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব-এর কতিপয় সদস্য এবং একজন কথিত রাজনীতিবিদ অভিযুক্ত সাত হত্যা মামলায় সেখানেও রাজনীতি এবং টাকার যোগসূত্র রয়েছে। অপরদিকে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে মাদক সেবনে বিত্তবান ঘরের ছেলে-মেয়েরা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। এদের পিতা-মাতারা অসহায়। তারাও হয়তো বিত্ত-ঐশ্বর্যের মধ্যে সন্তানদের হারিয়ে ফেলেছে। ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে বহু রেস্তোরাঁ আর কথিত স্টুডিও গজে উঠেছেযেখানে গভীর রাত পর্যন্ত বিত্তবানের ছেলেমেয়েরা সিসা নামক হুঁক্কাপানে আসক্ত হয়ে পড়েছেএর মধ্যে মাদক সেবনও চলছে। এদের বাবা-মায়ের প্রচুর অর্থ তারপরও হতাশায় ভুগছে। উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদের অনেক পরিবারে ফাটল ধরছে। সমাজব্যবস্থা এমন যে, কত নারী নির্যাতিত হচ্ছে অল্প বয়সে। কত বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যানও নেই

তবে শিশুহত্যার পরিসংখ্যান আতঙ্কজনক। প্রাপ্ত তথ্য মতে, শিশুহত্যার সংখ্যা ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩-তে ২১৮; ২০১৪-তে ৩৫০ এবং জুলাই ২০১৫-তে ১৯১। ২০১৫ থেকে পর্যন্ত তিনশ ওপরে ছাড়িয়ে গেছে
সমাজ তথা দেশে মারাত্মক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে নিশ্চয়ই আমরাথ্রো এওয়েবা ফেলে দেওয়ার সংস্কৃতিতে যেতে চাই না। তবে আমরা না চায়লে যে হবে না-তা নয়। সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জবাবদিহিতার অভাব, দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদশালী হওয়া এবং সুশাসনের অভাবই আমাদের দেশে ধরণের অস্থিরতার কারণ বলে মনে হয়। আমেরিকার সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের সাথে আমাদের হয়তো তুলনা সঠিক হবে না। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা, সুশাসনের অভাব এবং ভোগবাদের কারণেই পারিবারিক সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ। এখন অতীতের মতো স্কুলের পাঠ্য বইয়ের প্রবন্ধগুলোর মাধ্যমে নৈতিকতার বার্তা এখন প্রধান কোনো বিষয় নয়।

বর্তমানে সমাজে একটি বড়রকমের সমস্যা হলো ব্যাপক ভাবে সেলফোনের ব্যবহার। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা এখন এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম-এর স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। যে সেল ফোন ইন্টারনেট থেকে শুরু করে সবরকমের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। দিন দিন আপডেট হচ্ছে স্মার্টফোন। এসব সেলফোন কিশোর-কিশোরী, অপরিণত বয়সের তরুণ-তরুণীদের দেয়া মানে তাদের হাতে বিষ তুলে দেয়া। লেখা শুরু করেছিলাম তরুণী তাসফিয়ার মৃত্যু নিয়ে। তরুণী তাসফিয়ার লাশ ও ফাইল ছবি দেখে সহজেই বুঝা যায়, সে মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমরা কেউ জানি না তাসফিয়ার মতো এমন সুন্দর একজন তরুণী কি ভাবে এমন নির্মম ঘটনার শিকার হলো। হয়তো সে সেলফোন ব্যবহার করতো। সেলফোনের কল্যাণে সে হয়তো কিশোর প্রেমে জড়িয়েছিলো। ঘটনা যাই হোক না কেন। কোনো লাশের ছবি দেখতে আমার ভালো লাগে না। সে মৃত্যু স্বাভাবিক হোক আর অস্বাভাবিক। বিশেষ করে বিকৃত লাশের ছবি আমাকে একদম দূর্বল করে দেয়।

সব অভিভাবকের উচিত হবে তার সন্তানদের হাতে দামি সেলফোন তুলে দেয়ার একবার ভালো ভাবে চিন্তা করা যে, সে এর ব্যবহারের যোগ্য কিনা। 

Sigmund Freud বলেছেন, “I cannot think of any need in childhood as strong as the need for a father's protection”. (আমি মনে করি না যে, পিতার নিরাপত্তার চেয়ে কোনো প্রয়োজনই শিশুকালের জন্য মজবুত)