সূত্র: বিডিটুডে।
ইন্ডিয়া হলো শক্তের ভক্ত নরমের যম:
ইন্ডিয়া এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী দেশ-যে দেশটির সাথে কোনো প্রতিবেশী
দেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই। মূলতঃ ইন্ডিয়া নামের এ দেশটি হলো শক্তের ভক্ত
নরমের যম। শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ চায়না ও পাকিস্তানের সাথে এবং বাংলাদেশসহ
অন্যান্য ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ইন্ডিয়ার আচরণ ও কূটনীতির তারতম্য সঠিক ভাবে
পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি সহজেই বুঝা যায়। ইন্ডিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা এ
ছোট নিবন্ধে সম্ভবপর নয়। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের খিউরী বলে একটি দেশের সাথে আরেকটি
দেশের সম্পর্ক হবে দেশ থেকে দেশ বা রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র। ছোট ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর
সাথে ইন্ডিয়ার সম্পর্ক দেশ থেকে দেশ পর্যায়ে ছিল না কখনো। এসব প্রতিবেশী দেশগুলোতে
ইন্ডিয়া তার গরীব জনগণের রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে অত্যন্ত কৌশলে দালাল ও তাবেদার
লালন-পালন করছে। এ দালাল ও তাবেদাররা নিজ দেশের খেয়ে পড়ে ইন্ডিয়ার গীত গায় বা
স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশেও আছে ইন্ডিয়ার বিপুল দালাল ও তাবেদার।
এরা নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়ী হলেও এদের মুল কাজ হলো-ইন্ডিয়ার পা-চাটা ও
দালালী করা। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক, সীমান্তে ইন্ডিয়ার সীমান্ত
রক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশী হত্যা, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি ও যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ
চুক্তির ব্যাপারে তারা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার ধার ধারে না। অন্য দিকে যারা এ
বিষয়ে তাগিদ অনুভব করেন ও জোড়ালো ভূমিকা পালন করেন এবং এ বিষয়ে লেখালেখি করে তাদের
ইন্ডিয়া বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে অপ্রপ্রচার চালায় এ দালাল ও পদলেহনকারী গোষ্ঠী।
যদিও ছোট প্রতিবেশী দেশেগুলোর বিষয়ে ইন্ডিয়ার এ অপকৌশল কোনো দেশেই সফল হয়নি।
লিবারেশন টাইগার অব টামিল ইলম (এলটিটিই) শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘদীন যাবৎ বিচ্ছিন্নতাবাদী
আন্দোলন সশস্ত্র আন্দোলন করেছে। এ বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের পেছনের
মদদদাতা ছিল ইন্ডিয়া। ২০০৫ সালে চায়না ও কয়েকটি দেশের সহায়তায় শ্রীলঙ্কার
প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে এলটিটিই’র বিচ্ছিন্নবাদী আন্দোলন সম্পর্ণরূপে দমন
করেছেন। নেপালের রাজনীতিতেও নানা ষড়যন্ত্র ও কূটচাল চেলে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করার
চেষ্টা চালিয়েছে ইন্ডিয়া। কিন্তু সেদেশের জনগণের প্রতিরোধের মুখে ইন্ডিয়া পিছু
হটতে বাধ্য হয়েছে। ইন্ডিয়া শুধু সফল হয়েছে সিকিম দখলে। সিকিমের শাসক কাজী লেন্দুপ
দর্জিকে পুতুল হিসেবে ব্যবহার করে ১৯৭৪ সালে দেশটি দখলে নিয়েছিল ইন্ডিয়া। পার্বত্য
চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পেছনের মদদদাতা যে ইন্ডিয়া সেটা
না-ই বা বললাম। বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর থেকেই এদেশের রাজনীতিতে চানক্য নীতি
অব্যাহত রেখেছে ইন্ডিয়া। ২০০৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উপর ইন্ডিয়ার খবরদারী,
আধিপত্য বিস্তার, তাবেদার রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে অন্তর্ঘাত ও বাংলাদেশের স্বার্থ
বিরোধী তৎপরতা ব্যাপক ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ থেকে স্বাধীনতা লাভের
পর ইন্ডিয়ার ৭০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্টই উপলব্ধি করা যায় যে, এ দেশটি
শুধু প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিতে শিখেছে। বিনিময়ে কিছুই দিতে শিখেনি। নিজের
স্বার্থে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে কখনো রাজি নয় দেশটি। বাংলাদেশের বর্তমান জনপ্রতিনিধিত্বহীন
সরকার সবসময় বয়ান ও বাকওয়াজী করে যে, তারা নাকি ইন্ডিয়ার সাথে বাংলাদেশের মধুর সম্পর্ক
তৈরী করেছে। বাস্তবে কি তাই? ২০০৯ সালে ক্ষমতা পাওয়ার পর এ সরকার ইন্ডিয়াকে
দেদারসে সবকিছু দিয়ে দিচ্ছে। বিগত ৭ বছর যাবৎ ইন্ডিয়ার সাথে প্রকাশ্য বা গোপনে
লিখিত-অলিখিত বহু চুক্তি-সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি চুক্তি করা
হয়েছে যেগুলো মারাত্মক ভাবে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। এর মধ্যে কয়েকটি চুক্তি হলো: ১।
ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের বুক চিরে ইন্ডিয়ার নৌ-চলাচল চুক্তি। ২। চট্টগ্রাম ও মঙ্গলা
সমুদ্র বন্দর ব্যবহার চুক্তি। ৩। এশিয়ান হাইওয়ের নামে বাংলাদেশকে করিডোর হিসাবে
ব্যবহার চুক্তি। ৪। গ্যাস ট্রানজিটের নামে ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয়
৭টি রাজ্যে গ্যাস সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের ভূমিকে করিডোর হিসাবে ব্যবহার চুক্তি। ৫। টেলি ট্রানজিটের
নামে বাংলাদেশের ভূমিকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে ইন্ডিয়ার
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্যে টেলিযোগাযোগ কানেক্টিভিটি স্থাপন চুক্তি।
জনগণকে অন্ধকারে রেখে এতোগুলো জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিরোধী চুক্তির বিনিময়ে
কি পেয়েছে বাংলাদেশ? এর সঠিক উত্তর হলো-কিছুই পায়নি বাংলাদেশ। বড় একটা অশ্বডিম্ব
বা ঘোড়ার ডিম পেয়েছে! পশ্চিম বঙ্গের মূখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরোধিতার দোহাই
দিয়ে তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে নেপালের বেশ ভালো সম্পর্ক
রয়েছে। নেপালের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য যোগাযোগের পথে বড় বাধা একটি পথ। রংপুরের
বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর থেকে শিলিগুরী করিডোর পার হলেই নেপাল। এ করিডোরটির অবস্থান
হলো ইন্ডিয়া পশ্চিম বঙ্গে। এ করিডোরের দূরত্ব মাত্র ১৩ মাইল। ইন্ডিয়া তার নিজের
নিরাপত্তার অজুহাতে মাত্র ১৩ মাইলের একটি পথ বাংলাদেশকে ব্যবহার করার জন্য
ট্রানজিট দিতে রাজি নয়। অথচ বাংলাদেশের গণবিরোধী আওয়ামী সরকার ট্রানজিট চুক্তির
নামে পুরো বাংলাদেশকে করিডোর হিসাবে ব্যবহার করার চুক্তি করেছে ইন্ডিয়ার সাথে। এ
হলো আওয়ামী সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করা ইন্ডিয়ার সাথে মধূর সম্পর্কের কিঞ্চিত নমুনা।
ইন্ডিয়া এখন নতুন করে আবার বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রয় ও নিরাপত্তা
চুক্তি করার পাঁয়তারায় লিপ্ত হয়েছে। ইন্ডিয়া তাদের তাবেদার আওয়ামী লীগকে দিয়ে মনে হয় এ চুক্তি আদায় করে
নিতে চায়।
ইন্ডিয়া
নিজেই বড় এক প্রতিরক্ষা সামগ্রী আমদানীকারক দেশ:
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইউরোপের সাথে ইন্ডিয়ার প্রতিরক্ষা যোগাযোগ যতই বাড়ুক, দিল্লির এক নম্বর অস্ত্র সহযোগী এখনও সেই আদি ও অকৃত্রিম রাশিয়া। বেশ কিছুটা পরে থেকে আমেরিকা দ্বিতীয়।
২০১২ থেকে ২০১৬-র মধ্যে ইন্ডিয়ার প্রয়োজনীয় অস্ত্রের ৬৮ শতাংশ যোগান দিয়েছে রাশিয়া। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে এই তথ্য। এ সময়ে আমেরিকা রফতানি করেছে ইন্ডিয়ার প্রয়োজনীয় আমদানিকৃত অস্ত্রের ১৪ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইসরাইল। এ দেশটি ইন্ডিয়ার রফতানি করেছে ৭.২ শতাংশ অস্ত্র। সংশ্লিষ্ট সংস্থা জানাচ্ছে, যা পরিস্থিতি, সুদূর ভবিষ্যতেও রাশিয়াই ইন্ডিয়ার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে থেকে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। দিল্লি যে অস্ত্র আমদানি করে, তা চীন ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি। যাই হোক, ফ্রান্স, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও স্পেন থেকেও ইন্ডিয়ার অস্ত্র আমদানি বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প মেক ইন ইন্ডিয়ার আওতায় চেষ্টা করছেন যাতে ইন্ডিয়ায় অস্ত্র তৈরি বাড়িয়ে দেশের অস্ত্র ভাণ্ডারের আধুনিককরণ করা যায়। দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধ বিমান, বন্দুক ও সাবমেরিন তৈরি করতে ২৫০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্ধ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু স্টকহোমের সংস্থাটির দাবি, দেশে অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হলেও বিদেশ, মূলত রাশিয়া, আমেরিকা ও ইসরাইলের ওপর অস্ত্রের ব্যাপারে নির্ভর করতে হবে ইন্ডিয়াকে। কারণ দেশটিতে এখনো উন্নতমানের অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইন্ডিয়া নিজেই বড় এক
অস্ত্র আমদানীকারক দেশ-কেনই বা দেশটি বাংলাদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রয় করার জন্য উঠে
পড়ে লেগেছে? এর উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিস্কার। ইন্ডিয়া তার নিম্নমানের ও অকেজো অস্ত্র
গছিয়ে দিয়ে এক দিকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দূর্বল করতে চায়। অন্য দিকে বাংলাদেশের
রিজার্ভ লুট করতে চায়। মনে হচ্ছে হাসিনাকে চিরদিন ক্ষমতার রাখার মূলা ঝুলিয়ে রেখে
এ চুক্তি আদায় করে নিতে চায় দেশটি। নিরাপত্তা চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে
সেনাবাহিনী এ চুক্তির বিষয়ে অনাপত্তি দিয়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট-এর
বক্তব্য ও মার্কিন-ইন্ডিয়া সম্পর্ক:
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে ইন্ডিয়া বা চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। আমি বিশ্বাস করি একটি অগ্রসর, নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশের লক্ষ্যকে ইন্ডিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে সহায়তা দেয়ার জন্য একের বেশি দেশের ভালো ধারণা ও সম্পদ প্রয়োজন রয়েছে। ‘চীন, ইন্ডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র: বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা মূলক সহযোগিতা’ বিষয়ক এক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত একথা বলেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে ইন্ডিপেডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) এ সম্মেলনের আয়োজন করে। বার্নিকাট বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের প্রকল্পগুলোতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো আগ্রহী। তবে ব্যবসার পরিবেশ হতে হবে পরিষ্কার, স্বচ্ছ। আইন ও বিধি-বিধান হতে হবে প্রয়োগযোগ্য। দরপত্র সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদকে শ্রদ্ধা জানানো হবে। অংশীদার হিসেবে সাথে থাকা বেসরকারি খাত ও সরকার তাদের চুক্তি পূরণ করতে হবে। তবেই যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর আস্থা অর্জন করা যাবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক শ্রম আইন, পরিবেশ ও মান বাস্তবায়ন করে থাকে। এ মান স্থানীয় শিল্পগুলো অর্জন করলে বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় আরো সক্ষমতা অর্জন এবং অধিকতর বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে। দক্ষিণ এশিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে ‘অসম্পৃক্ত অঞ্চল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির অভাবে বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী দেশগুলো ব্যাপক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৌলিক সব উপাদান রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে দুই দশকের বেশি সময় ধরে ছয় শতাংশের অধিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি। তারুণ্য নির্ভর বড় নির্ভরযোগ্য শ্রমশক্তি। ১৬ কোটি মানুষের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। সক্রিয় বেসরকারি খাত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্য কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থান। বার্নিকাট বলেন, গত এক দশক ধরে সরকার অবকাঠামো প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি আঞ্চলিক কানেক্টেভিটির সহায়ক। মার্কিন
রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক সুন্দর ও বাস্তব কথাই বলেছেন। তবে, আসল কথাটা
বলেননি। সেটা হলো: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইন্ডিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ায় তার লাঠিয়াল
বানাতে গিয়ে নিজের ফাঁদেই আটকা পড়েছে। মনে হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতোদিন
দুধ-কলা খাইয়ে ঘোখড়া লালন-পালন করেছে। দেশটি ইন্ডিয়ার সাথে বেসামরিক পরমাণু চুক্তি
করেছে। অধ্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ইন্ডিয়াকে বলিয়ান করেছে। উদ্দেশ্য
একটাই-দক্ষিণ এশিয়ায় তার লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা। এখন মনে হচ্ছে ইন্ডিয়া ঘোখড়া
সাপের মতো উল্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই ছোবল মারতে উদ্যত হয়েছে। বোদ্ধা মহল
নিশ্চয় ভুলে যায়নি যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একদলীয় নির্বাচনের আগে সাবেক মার্কিন
রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিই মজিনা তার কলিগ নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত মার্কিন
রাষ্ট্রদূতের সাথে বাংলাদেশের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য
ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন। মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী সে সময় নয়াদিল্লীর
কর্মকর্তাদের সাথে মার্কিন কর্মকর্তাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। সচেতন মহলের
ভুলে যাবার কথা নয় যে, ইন্ডিয়া তার নিজের স্বার্থ ও ফায়দা হাসিল করার জন্য
বাংলাদেশের একদলীয় নির্বাচনের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ম্যানেজ করেছিলেন। একই
ভাবে প্রভাবিত করে ভন্ডুল করা হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘের সমঝোতার
প্রচেষ্টাকে। ২০০৭ সালের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক
পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করেছে নিজের চোঁখে নয়-ইন্ডিয়ার চোঁখ দিয়ে। ৫ জানুয়ারির
নির্বাচনকে সমর্থন না দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বর্তমান
জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারকে আরো বেপরোয়া করে তুলতে সাহায্য করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র মনে হয় এখন বাস্তব পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি সবসময় একরকম
থাকে যে, এটাই সৃষ্টির নিয়ম। তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে
যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্য মূলক পলিসি’র উপর
প্রভাবিত হলে সামনে অনেক বিপদজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে দেশ থেকে দেশ পর্যায়ে। ইন্ডিয়া
বা অন্য কোনো তৃতীয় রাষ্ট্রের ওপর প্রভাবিত হয়ে নয়।
নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে সেনাবাহিনীর অনাপত্তি এবং
চায়না মর্নিং পোস্ট-এর নিবন্ধ:
মিডিয়ার প্রকাশিত রিপোর্ট
অনুযায়ী সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে অনাপত্তি দিয়েছে।
অর্থাৎ আলোচিত বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনী যে
কোনো উছিলায় বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কথিত সন্ত্রাস ও জঙ্গি
দমন অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে কাজ করতে হবে ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর কমান্ডোর
অধীনে। এ ধরণের কোনো চুক্তি হলে নিশ্চিত ভাবেই বাংলাদেশ কাশ্মীর বা প্যালেস্টাইনের
পথেই হাটবে। পুরোপুরি বন্ধক হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এদিকে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এ
বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধটি লিখেছেন: সুবির ভৌমিক। সুবির ভৌমিক-এর সাথে দিল্লীর কর্মকর্তাদের বেশ
ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। নিবন্ধটির শিরোনাম হলো: “Keener
on arm from China, Bangladesh dithers defense pact with India” অর্থাৎ, “চীন থেকে অস্ত্র কিনতে আগ্রহী, তাই ইন্ডিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের দ্বিধা”। নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্ডিয়ার সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে আগ্রহী। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ইন্ডিয়ার প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, দিল্লী চায় চীন থেকে না কিনে ইন্ডিয়া থেকে অস্ত্র কিনুক বাংলাদেশ। কিন্তু সেনাবাহিনীর কথা হচ্ছে, ইন্ডিয়া নিজেই বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করে। এর অর্থ তারা নিজেরাই নিজেদের অস্ত্রকে মান সম্পন্ন মনে করে না। এমন অবস্থায় ইন্ডিয়া থেকে অস্ত্র আনতে রাজি নন বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নেপাল এবং মিয়ানমার এর আগে ইন্ডিয়া থেকে অস্ত্র কিনে সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু দিল্লী নাছোড়বান্দা। তারা বাংলাদেশকে চীন থেকে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম কিনতে দেবে না। এমনকি গত দু মাস আগে চীন থেকে কেনা সাবমেরিনের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন দিল্লীর কর্তারা। তাদের কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের সাবমেরিন লাগবে কেন? এ অবস্থায় শেখ হাসিনা পড়েছেন বড় চাপে। এক দিকে তিনি সেনাবাহিনীর বিষয়াদিতে সেনা কর্তৃপক্ষের মতামতকেই গুরুত্ব দিতে চান। তাদের ক্ষেপিয়ে তিনি কিছু করতে চান না। অন্য দিকে দিল্লীকেও বিগড়াতে পারছেন না তিনি। দক্ষিণ পাড়া আর উত্তর পাড়াকে সন্তুষ্ট রাখা তার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার চায়নারও প্রবল চাপ অঅছে। গত বছর ২৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি সই করা হয়েছে বেইজিংয়ের সাথে। এদিকে দৃষ্টি দিয়ে বেইজিংকেও সন্তুষ্ট রাখতে হবে। শেখ হাসিনা সমাধান হিসেবে আপাতত চাচ্ছেন ইন্ডিয়ার সাথে ২৫ বছর মেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তিটি এখন না হয়ে পরে হোক। আপাতত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে সেনাবাহিনী ও দিল্লী উভয়কেই সন্তুষ্ট রাখতে চান তিনি। প্রথম দিকে এতে দিল্লী রাজি না হলেও এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে। এর বিনিময়ে শেখ হাসিনা শিগগিরই মূল চুক্তি করার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু
বাস্তব ব্যাপার হলো: বাংলাদেশের মানুষ ইন্ডিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার চুক্তি
বা নিরাপত্তা চুক্তি কোনোটার ব্যাপারেই অনাপত্তি দেবে বলে মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা
হলো: বাংলাদেশের মানুষ কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বিনিময়ে প্রতিরক্ষা
ও নিরাপত্তা চুক্তির নামে ইন্ডিয়ার সাথে দেশ বন্ধকের চুক্তি করতে রাজি নয়। কারণ তারা
চায় না তাদের প্রিয় দেশ কাশ্মীর বা প্যালেস্টাইনের পথে এগিয়ে যাক।


0 মন্তব্যসমূহ